20 October 2020

ভবঘুরে

  • চ্যানেল১৯.নিউজ
  • আপডেট: Sunday, October 4, 2020
  • 50 বার

ঘুমে চোখটা লেগে এসেছে। তখনই দরজায় কড়া নাড়ার খুটখুট শব্দ হলো। এই ভরদুপুরে একমাত্র দোলা ছাড়া অন্য কারো ছাদে আসার কথা নয়। দরজা খুললেই টুপ করে ঢুকে পড়বে। দুনিয়ার গল্প জুড়ে দেবে। আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। ইচ্ছে করেই চোখ বন্ধ করে আছি।
কোনো লাভ হলো না। একটু পর আবার খুটখুট..খুটখুট শব্দ। অগত্যা উঠে দরজা খুলে দিলাম। যা ভেবেছি তা-ই। দোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মুখভর্তি রাজ্য জয় করা হাসি।

বললাম, ‘দরজা জুড়ে মূর্তিবত দাঁড়িয়ে কেনো?’
‘তোমার অনুমতির প্রতীক্ষায়।’
‘অনুমতি না দিলে ঢুকবে না?’
‘ঢুকবো। এটা শুধু ভদ্রতা।’
‘সময় নষ্ট না করে ভেতরে এসো।’

দোলা ভেতরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
‘দোলা কী দেখছ?
‘বসার টুলটা দেখছি না যে, লাল প্যালাস্টিকের টুলটা গেল কোথায়?’
‘আর বলো না। ওটার একট পায়া ভেঙে গেছে। ফেলে দিয়েছি। তুমি বরং চৌকিতেই বসো।’

‘আমার বসার জন্য না। হাতের জিনিসটা ওটার ওপর রাখতে চেয়েছিলাম। একটা মাত্র টুল তোমার ঘরে, তাও ভেঙে গেল। কীভাবে ভাঙল?’
‘ওটার ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যান পরিস্কার করতে গিয়েছিলাম। প্যালাস্টিকের টুলের এই এক সমস্যা ভাঙলে আর কাজে লাগানো যায় না। কাঠের হলে রিপেয়ার করা যেত। তা তোমার পটের মধ্যে কী?’

‘তোমার জন্য পিঠা এনেছি।’
‘কী ব্যাপার! হঠাৎ আমার জন্য আবার পিঠা কেনো? নিশ্চয়ই তোমার মা বানিয়েছেন?’
‘হুম, তোমার আইডিয়া একশভাগ সঠিক। এই পিঠা মা তোমার জন্য বানিয়েছে।’

‘কী সৌভাগ্য আমার। খালাম্মা আমার ভীষণ ভীষণ পছন্দের পিঠা বানিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু উনি আমার পছন্দের কথা জানলেন কী করে?’

‘তাসীন ভাই, সেদিন তুমি বলেছিলে না, পিঠার মধ্যে আমার একমাত্র তালের পিঠাই পছন্দ। বাজার থেকে তাল আনিয়ে আমিই বানাতে চেষ্টা করেছিলাম। খুব কঠিন তাই সম্ভব হয়নি। মা দেখে বললেন, দে আমি করে দেই। তালের পিঠা উনি খুব ভালো বানাতে পারেন।’

‘এটা তুমি ঠিক করনি দোলা। শুধু শুধু খালাম্মাকে কষ্ট দিয়েছ।’
‘মোটেই না। মা আনন্দের সঙ্গে কাজটি করেছেন। এবং বললেন, একটু আগে তাসীনকে ছাদে উঠতে দেখলাম। এখনই পিঠা দিয়ে আয়। ও একবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে কখন ফিরবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।’

‘দোলা তুমি কী আমাকে বাড়ি ছাড়া করার চিন্তা করেছ?’
অবাক বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘বুঝলাম না, কী বলতে চাইছ তুমি?’

‘শোন, একজন ব্যাচেলরের সবথেকে কঠিন কাজ হলো ঢাকা শহরে একটা বাসা খুঁজে পাওয়া। তোমার বাবাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তোমাদের ছাদের এই চিলেকোঠা ভাড়া পেয়েছি। উনাকে অনেক কষ্টে ম্যানেজ করতে হয়েছে। বাবা যদি জানতে পারেন, তুমি সুযোগ পেলেই আমার রুমে চলে আস। তবে নিশ্চিত, খাড়ার ওপর আমাকে রুম থেকে বের করে দেবেন।’

‘তোমার কী ধারণা বাবার একার সিদ্ধান্তে তোমাকে এখানে থাকতে দেয়া হয়েছে?’

‘ভাড়া নিতে এসে তোমার বাবার কঠিন ইন্টারভ্যুই তো আমাকে ফেস করতে হয়েছে।’

‘বাবা শুধু ইন্টারভ্যূর রোল প্লে করেছে। কোশ্চেনগুলো মা-ই তৈরি করে দিয়েছে। মা পারমিট করেছে বলেই তুমি ছাদের রুমে থাকতে পারছ। তোমার ভাগ্য যে, মা তোমাকে পছন্দ করেছে।’
তারপর হাসিহাসি মুখে আন্তরিকতার সঙ্গে পটের মুখ খুলে পিঠা আমার সামনে তুলে ধরল দোলা।

কলা পাতা দিয়ে মোটা মোটা করে তালরুটি ভেজেছে। পাকা তালের মিষ্টি গন্ধ নাকে এল। ঠিক কতদিন আগে তালের পিঠা খেয়েছি মনে নেই। ‘খুব চমৎকার পিঠা বানিয়েছেন খালাম্মা।’

একটা পিঠা হাতে তুলে দিয়ে দোলা বলল, ‘খেয়ে দেখ, আরো চমৎকার লাগবে।’
‘তুমি খেয়েছ?’
‘না, আমার তালপিঠা খেতে ভালো লাগে না।’
‘তা হলে চমৎকার বুঝলে কী করে?’
‘আমার মায়ের হাতের পিঠা ভালো না হয়ে পারেই না।’

নাস্তা করে শুয়েছিলাম। তেমন ক্ষুধা নেই। এখন কিছু খেলে ঘুমও আসবে না। তারপরও কোনো সুন্দরী যখন পছন্দের খাবার মুখের সামনে তুলে ধরে তা ফিরিয়ে দেই কী করে? আমি একটা পিঠা মুখে তুলে নিলাম।

দোলা সহাস্যে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চিলেকোঠার ছোট জানালা থেকে তেরছা আলো এসে পড়েছে দোলার খোলা চুলে, মুখের কিছু অংশে। এটা খুব সুন্দর দৃশ্য। ওকে দেখতে এখন অপূর্ব লাগছে।

একটা পিঠা শেষ করে বললাম, ‘অসাধারণ, সত্যি তুলনা হয় না।’
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দোলা বলল, ‘বলেছিলাম না, মা খুব ভালো রান্না করেন।’

‘সব সন্তানের কাছেই তার মায়ের রান্না অসাধারণ। আর খালাম্মার রান্না হয়েছে অসাধারণের পরও আসাধারণ। দোলা, পিঠাগুলো এখানে একটা বাটিতে রেখে তুমি তোমার পট নিয়ে চলে যাও। তা না হলে একটু পর আবার পট নিতে এসে আমাকে বিরক্ত করবে।’

‘কী…কী বললে তুমি, আমি তোমাকে বিরক্ত করি?’
‘না,মানে আমার ঘুমের ডিস্ট্রাব হবে।’

‘দিনের বেলায় ঘুমানোর সময়? আমি তো রাতে আসি না কখনো।’
‘দোলা তুমি তো জানো, আমি রাতে জেগে থাকি, দিনে ঘুমাই।’
‘তারমানে তুমি নিশাচর।’
‘জানি না আমি কী। তুমি এখন চলে যাও। আমাকে ঘুমাতে দাও।’
এরপর একটা ঝামটা মেরে দোলা বেরিয়ে যায়। আমি নিশ্চিত দোলা একটু পর কোনো অজুহাত নিয়ে আবার আসবে।

বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে, কফির পানি চড়িয়ে রেখে ছিলাম। মুখ হাত ধুয়ে ফ্রেস হয়ে এক মগ কফি নিয়ে বসেছি। নিজের হাতে বানানো কফি খোলা ছাদে বসে খেতে অসাধারণ লাগছে। একটু পরই বেরিয়ে পড়ব। মনে মনে ভাবলাম আজকের গন্তব্য কোথায়? উত্তর এলো জানি না।

আসলে প্লান করে আমার বের হওয়া হয় না। বাসা থেকে বেরিয়ে যেদিক ইচ্ছে চলে যাই। কফির শেষ চুমুক দেব তখন বশির সাহেব এসে আমার সামনে দাঁড়াল। মধ্যবয়স্ক বশির সাহেব স্বল্পভাষী, বিশ্বস্ত। আরুবার ম্যানেজার। এর আগেও বেশ কয়েকবার আমার কাছে খোঁজ খবর নিতে এসেছে। আজ আবার কী খরব নিয়ে এসেছে কে জানে?

‘কী খবর বশির সাহেব, কেমন আছেন?’
‘ভালো।’
‘আরুবা ম্যাডাম পাঠিয়েছেন।’
‘বুঝতে পেরেছি। তা কী সংবাদ বলুন।’
‘গত তিনদিন ধরে ম্যাডাম আপনাকে ফোনে পাচ্ছেন না।’
সামান্য হেসে বললাম, ‘পাবে কী করে, কদিন ধরে তো আমার মোবাইলই নেই।’

বশির সাহেব তার ব্যাগের মধ্যে থেকে মোবাইলের একটা নতুন প্যাকেট বের করল। প্যাকেটটি আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম মোবাইল সেটটি আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। উনি বললেন, আপনি নাকি আবারো সেট হারিয়েছেন।’

আরুবা যতবার আমাকে মোবাইল সেট গিফট করে ততবারই হারায়। আর কতবার পাঠাবে। মোবাইল ব্যবহার করতে আমার একদম ভালো লাগে না। শুধু আরুবার জন্যই মোবাইল ব্যবহার করতে হয়। আমাকে মোবাইলে না পেলে ও অস্থির হয়ে যায়।

‘স্যার আর একটা ইনফরমেশন।’
‘কী সেটা?’
‘মোবাইল সেটের ভেতর ম্যাডাম সিম ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আপনাকে নতুন করে কিছু করতে হবে না।’

বশির সাহেবের কাজ শেষ। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছেন।
আমি বললাম, ‘বশির সাহেব এক কাপ কফি খেয়ে জান।’
‘দুঃখিত। আমি কফি পান করি না।’
‘তা হলে অন্য কিছু…?
‘নো থ্যাঙ্কস। এখন আমি যাই স্যার।’
বশির সাহেব সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে গেলেন।

শহরের ফুটপাথগুলো দীর্ঘদিন ধরে বেদখল হয়ে আছে। পথচারী রীতিমতো অসহায়। কর্তৃপক্ষ গাড়ি দিয়ে চলাচল করে বলেই হয়তো এদিকে নজর দেয় না। ফুটপাথগুলো যে যার মতো দখল করে রেখেছে। সবথেকে ভয়াবহ অবস্থা লোহালক্কর আর পাইপের দোকানের সামনের ফুটপাথগুলো। ওরা পথচারীদের মানুষ বলেই গণ্য করে না। কার চোখ গেল না মাথা ফুটো হয়ে গেল এ নিয়ে ওদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো হেনস্তার শিকার হতে হয়। ওদের ভাবখানা এমন যে, আমার দোকানের সামনে ফুটপাথ আমার! এখান দিয়ে কারো চলাচলের অধিকার নেই! হায় খোদা! এদেশে আইন-কানুন বলতে কী কিছু নেই!

আমি হেঁটে চলেছি শহরেরই কোনো এক ফুটপাথ ধরে। এই এলাকাটা একটু নিরিবিলি। অনেকটা পরিচ্ছন্ন আর চওড়া ফুটপাথ। হাঁটতে গিয়ে ধাক্কা লাগে না, হোঁচট খেতে হয় না। এটাই স্বস্তি।
এখন যাচ্ছি একটা লেকের পাশ দিয়ে। লেকেরও জীর্ণদশা। জবর দখলের কবলে পড়েছে। শহরের সব নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, খেলার মাঠ, যাত্রী ছাউনি থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত গ্রাস করেছে দখলবাজরা। সব বেদখলের শহরে এই উদ্যানটি যে এখনো টিকে আছে, এটাই বা কম কিসে?

লেকের জলে গাছের লম্বা ছায়া পড়েছে। গাছগাছালি আর ঝোপঝাড়ের জন্য ফুটপাতও কিছুটা অন্ধকার। স্ট্রিট লাইটগুলো এখনো জ্বলে ওঠেনি। আমি হেঁটে চলেছি আপন মনে। হঠাৎ বেড়ালের মেউ মেউ শব্দে একটু চমকে উঠলাম। ঝোপঝাড়ের দিকে তাকালাম। কোথাও বেড়াল দেখতে পেলাম না।

ভুল শুনলাম না তো! একটু থেমে আবার হেঁটে চলেছি। এদিকটা আরো নিরিবিলি। আবারো বেড়ালে ডাক। কিন্তু বেড়াল দেখতে পাচ্ছি না। গা ছমছম করে উঠলো। এবার জোরে জোরে পা ফেলে এগোচ্ছি। কিন্তু বেড়াল পিছ ছাড়ছে না। অনবরত মিউ মিউ করেই যাচ্ছে।

আশ্চর্য কোথাও বেড়াল দেখতে পাচ্ছি না। শেষ পর্যন্ত বেড়াল আবিস্কার করলাম পকেটে। টেনে বের করলাম। রিসিভ করে বললাম, ‘হ্যালো’

‘কী ব্যাপার ফোন রিসিভ করছ না কেনো?’
‘ফোন রিসিভ করব কী। আমি তো বেড়াল খুঁজে বেড়াচ্ছি।’
‘তার মানে কী’
‘মানে আবার কী, তুমি তো বেড়ালে ডাক রিংটোন সেট করে দিয়েছ। এ রকম অদ্ভুত কোনো রিংটোন হতে পারে এটা তো আমার কল্পনাই ছিল না।’

‘আরুবা হেসে কুটি কুটি। তাই নাকি! বুঝেছি এটা বুশরার কাজ। ওকে একটা রিংটোন সেট করতে বলেছিলাম। সে যাক, মোবাইল পছন্দ হয়েছে?’

‘হয়েছে। তুমি ফরনাথিং একটা দামি সেট পাঠিয়েছ। কোনো দরকার ছিল না। ফোন রিসিভিং আর কলিং ছাড়া তো আমি অন্য কিছু করি না। সবথেকে কমদামি একটা সেট দিলেই ভালো হতো। এটা আবার কবে নিখোঁজ হয়ে যায় কে জানে!’

‘মোবাইল নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। যতবার হারাবে আমি ততবার নতুন সেট পাঠাব। মোবাইল সেট আমার কাছে কোনো বিষয় নয়। তোমার সঙ্গে কানেকটেড থাকাটাই বড় কথা। থাক ওসব, তুমি এখন কোথায়?’

‘আমি শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
‘তুমি রাতের বেলা শহরময় ঘুরে বেড়ায় সেটা তো জানি। কিন্তু কোন এরিয়ায় আছ সেটা জানতে চাচ্ছি।’

‘বারিধার গুলশান, লেকের পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।’
‘তুমি আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে পারবে?’
‘কখন?’
‘তোমার যখন সময় হবে। আমি অপেক্ষায় থাকব।’
‘আচ্ছা সময় করে চলে আসব।’
‘ধন্যবাদ।’
‘তোমাকেও ধন্যবাদ। এখন রাখলাম।’

ঘুরতে ঘুরতে অনেক সময় পার হয়েছে। এখন কটা বাজল? হাতঘড়ি নেই। মোবাইল স্ক্রিনে সময় দেখে নেয়া যায়। দেখেই বা লাভ কী। আমি তো সময় ধরে চলি না। শহরের নিরিবিলি এলাকা ছেড়ে ব্যস্ত এলাকায় ঢুকেছি। এটা সম্ভাবত এই শহরের ব্যস্ততম এলাকার মধ্যে একটি। ফুটপাথ নাকি হাট-বাজার তা দেখে বোঝার উপায় নেই। যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসসহ নানা রকমের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে হকাররা।

এছাড়া আছে নানা রকমের চিকিৎসা ব্যবস্থা। এমন কোনো রোগ নেই যার ওষুধ পাওয়া যায় না এখানে। সবথেকে বেশি পাওয়া যায় যৌনরোগের ওষুধ। ‘বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। একশো পার্সেন্ট গ্যারান্টি। বিফলে ভাড়াসহ মূল্য ফেরৎ।’

ওষুধের কাছে জটলা করে দাঁড়িয়ে তথাকথিত চিকিৎসকদের কথা মনোযোগ দিয়ে গিলে যাচ্ছে। কেউ কেউ আড়চোখে অ্যালবাম ভর্তি নগ্নছবির দিকে তাকাচ্ছে। মানুষজন ভিড় করে ছবি দেখছে আর ওষুধ কিনছে।

ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি। পাশ থেকে বোরকা পরা একটি মেয়ে হাত ইশারা করে ডাকছে, ভাই শোনেন…এই যে একটু শোনেন ভাই…। কাছে গিয়ে বললাম, ‘বলেন কী সমস্যা?’

মেয়েটি রীতিমতো কাঁদছে। একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, দয়া করে এই নম্বরে আপনার মোবাইল থেকে একটা ফোন লাগিয়ে দেবেন?,

আমি হেসে ফেললাম।
‘চিন্তা কর না। আমি তোমার সব সমস্যার সমাধান করে দেব। আমার সঙ্গে চল।’

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি ভড়কে গেল। কান্না থামিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল, ‘কোথায় যাব আপনার সঙ্গে?’

‘এই তো রাস্তার ওপারেই। মডেল থানায়। এর আগে তোমার মতো আরও অনেক মেয়ের সাহায্য করেছি। এসো এসো।’
অবস্থা বেগতিক দেখে মেয়েটি দ্রুত সটকে পড়ে।

শহরজুড়ে প্রতারকদের প্রতারণার জাল পাতা। নতুন নতুন কৌশল তাদের। সাধারণ পথচারী প্রতিনিয়তই তাদের জালে আটকা পড়ছে। ওদের হাতে প্রাণও যায় অনেকের। যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারী আবশ্যক। নচেৎ আপনিও ধরা খেতে পারেন।

ভয়াবহ রকমের জটলা এড়িয়ে একটু ফাঁকায় এসেছি। ফুটপাথ ঘেষে নামিদামি পোশাকের শো-রুম। বাহারী সব নাম। ইংরেজি কিছু নাম এত বেশি স্টাইল করে লিখেছে যে পড়তে অসুবিধা হয়।। দোকানে ক্রেতাদের চোখে পড়ার মতো ভীড়। ক’দিন আগেই তো ঈদ গেল। এখন আবার কোন উৎসব চলছে কে জানে!

হঠাৎ একটা টিয়ে পাখি চোখে পড়ল। আজকাল শহরে যেখানে কাকই সহজে চোখে পড়ে না, সেখানে টিয়ে পাখি! তা আবার রাতের বেলা। পাখির দিকে এগিয়ে গেলাম। খাঁচার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ঘুমিয়ে আছে নাকি মানুষের অত্যাচারে বিরক্ত বুঝা যাচ্ছে না।

পাশে মলিন পাজামা পাঞ্জাবী পরিহিত একজন বসে আছে। চাচার মুখভর্তি গোফদাড়ি। হাতে হস্তরেখার একটি বই। গভীর মনোযোগ বইয়ের দিকে । তার সামনে একটা পলিথিন বিছানো। খড়িমাটি দিয়ে ফুটপাথের ওপর একখানা হাতের ছবি এঁকে রেখেছে। সেখানে লেখা-‘টিয়া পাখির গণনা ও হাত দেখে ভাগ্য গণনা।’

আগ্রহ নিয়ে বললাম, ‘চাচা, আপনার টিয়ে পাখি কী মানুষের ভাগ্য গণনা করতে পারে?’

পানখাওয়া লালচে দাঁত বের করে হাসল চাচা।
‘হাতি, উট,কচ্ছপ ওরা পারলে আমার টিয়া কেন পারবে না, অবশ্যই পারবে।’

‘বুঝলাম না, হাতি, উট, কচ্ছপ…?

‘কেনো বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় দেখেন নাই? হাতি কচ্ছপ কীভাবে খেলার রেজাল্টের ভবিষ্যৎবাণী করে দিল।’

‘ও বুঝেছি। তা আপনার পাখি কী কথা বলতে পারে?’
‘পারে, তবে আমার সঙ্গে। আমি ওর কথা শুনতেও পারি বুঝতেও পারি। তা বাবাজি আপনে ভাগ্য গণাইবেন?’

‘কে গণনা করবে, আপনি না আপনার পাখি?’
‘আপনার মর্জি। তবে ইদানিং পাখি আর জীবজন্তুর প্রতি মানুষের আস্থা বেশি।’

‘আচ্ছা টিয়ে পাখি দিয়েই গণনা করেন।’
‘আপনার ডাইন হাত টিয়ার খাঁচার উপর রাখেন। হাত নাড়াইবেন না। দম বন্ধ রাখবেন।।
‘আচ্ছা রাখলাম।’

এরপর চাচা তার লাঠি টিয়া পাখির সামনে ধরল। পাখিটি লাঠির ওপর উঠে দাঁড়াল। তারপর টিয়াটি আমার মাথার ওপর ছেড়ে দিল। পাখিটি আমার মাথা থেকে হেঁটে হেঁটে নেমে এল খাঁচায়। খাঁচা থেকে নেমে নিচে রাখা অনেকগুলো খামের থেকে একটি খাম ঠোঁট দিয়ে তুলে চাচার সামনে রাখল।

তারপর খামের ভেতর থেকে একটি কাগজ বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, বাবাজি, এখানেই আপনার ভাগ্য লেখা আছে।
আমি কাগজটি আমার চোখের সামনে মেলে ধরলাম।

‘আপনি পরোপকারী। খুব নরম মনের মানুষ।
আপনি খুব সহজে মানুষকে বিশ্বাস করেন।
কিন্তু সুযোগ পাইলেই মানুষ আপনাকে ঠকায়।
ধৈর্য্যহারা হইবেন না, আপনার সুদিন আসিবে।
খুব শ্রীঘ্রই লটারী জেতার সম্ভাবনা রহিয়াছে।
বিদেশে যাওয়ার ভালো সুযোগ আছে।
সব সময় মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করুন।’

কাগজখানা পড়ে আমি লোকটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। উনি আমার হাসির কোনো অর্থ বোঝার চেষ্টা করল না। হাতি বাড়িয়ে বলল, ‘দেন,গণনার টাকা দেন।’

আমি বললাম, ‘চাচা আমি আর একবার গণনা করাতে চাই।’

চাচা আমার ওপর বিরক্ত হলো। ‘আপনাদের মতো শিক্ষিত মানুষের এই এক সমস্যা। সবকিছুতেই অবিশ্বাস। কেনো আবার গণাইতে চান। যেটা প্রথমবার উঠছে ওটাই আপনার ভাগ্য। এরপর একশো বার গণাইয়াও লাভ হইব না।’

‘আপনার সমস্যা কী? যতবার গণনা করাব ততবার টাকা দেব।’
‘আমার তো সমস্যা নাই। আপনি হাজার বার গণান। আমি টাকা পাব কিন্তু ভাগ্য আপনার বদলাইবে না।’

এখানে রাখা প্রতিটি খামের মধ্যেই প্রায় একই রকম লেখা রয়েছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না। আর এ কারণেই চাচা দ্বিতীয়বার পাখির গণনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমি আর চাচাকে ঘাটাতে চাইলাম না।

‘আচ্ছা বলেন আপনাকে কত দেব?’
‘দেন আপনার যা মনচায়।’
‘আপনার একটা রেট আছে না?’

‘বাবাজি, আমার কথা বাদ দেন, আমি খাই বা না খাই পাখিটারেও তো খাবার দিতে হয়। ইনসাফ কইরা দেন।’

আমি একশ’ টাকার একটা নোট দিলাম। চাচা টাকা হাতে পেয়ে প্রাণখোলা চওড়া একটা হাসি দিল।
‘চাচা, কদিন পর এসে জানিয়ে যাব আপনার পাখির গণনা কতটা সঠিক।’

চাচা আমাকে হাতধরে টেনে পাশে বসালেন। ‘শোনেন বাবাজি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ ভবিষ্যৎ জানে না। এক মুহূর্ত পর কী ঘটবে তা কি আমি বা আপনি বলতে পারব? অবশ্যই না।’

‘সব জেনেশুনে আপনি এসব করছেন কেনো?’

‘হতাশাগ্রস্থ দুর্বলচিত্রের কিছু মানুষকে সান্ত্বনা দেয়া। ওরাও যে পুরোপুরি বিশ্বাস করে তাও কিন্তু না। তারপরও ভবিষ্যতে ভালো কিছু ঘটবে এটা ভেবেই ওরা আনন্দ পায়। আর আমি ওদের খুশি মুখ দেখে আনন্দ পাই। মাঝখান দিয়ে পাখিটা আর নিজের সংসার চলে যায়। ওই যে খামগুলো দেখছেন ওর মধ্যে সব আশা জাগানিয়া কথা লেখা। ভালো কথাগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখেছি। কোনো হতাশা বা নেগেটিভ কথা নাই। টাকার বিনিময়ে ওদের দুঃসংবাদ দিতে যাব কোন দুঃখে?’

চাচার সত্য উপলব্ধির কথা শুনে ভালো লাগল। আবার দেখা হবে বলে উঠে দাঁড়ালাম। ইতিমধ্যেই অনেক রাত হয়ে গেছে।
আবার মিউ মিউ শব্দ পেলাম। এবার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, এটা আরুবার ফোন।

‘তাসিন এখন তুমি কোথায়? একজ্যাক্ট লোকেশন বলো।
‘লোকেশন দিয়ে কী দরকার?’
‘আমি গাড়ি নিয়ে আসব। সারারাত তোমার সঙ্গে ঘুরব। রাতের ঢাকা দেখব।’

আমি লোকেশন বলে দিলাম। এখন রাস্তা ফাঁকা। আধা ঘণ্টার মধ্যে ও চলে আসবে। আরুবাকে আমি ভালো করে জানি। ও যা বলেছে তার একচুলও নড়চড় হবে না। অতঃপর নির্দিষ্ট লোকেশনে আরুবার অপেক্ষায় থাকি।

All Right Reserved by © 2017-2020 | Privacy Policy |