18 September 2020

মাছের চামড়ায় তৈরি হচ্ছে জুতা-ব্যাগসহ মূল্যবান পণ্য

  • চ্যানেল১৯.নিউজ
  • আপডেট: Friday, August 14, 2020
  • 5 বার

গাছের বাকল কিংবা পশুর চামড়া দিয়ে আদিকালে মানুষ লজ্জা নিবারণ করত। সেখান থেকেই আসে পোশাকের ব্যবহার। এরপর থেকে বিভিন্নভাবে সুতা দিয়ে কাপড় বুনে তৈরি হতে থাকে পোশাক। এছাড়াও বিভিন্ন যুগে পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি হতে থাকে পোশাকসহ বেল্ট, ব্যাগ, জুতা, আরো নানা ব্যবহার্য জিনিস।



জানেন কি? চামড়ার মধ্যে সবচেয়ে দামী হচ্ছে কুমিরের চামড়া। এই চামড়া থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য সারা বিশ্বে অনেক বেশি চাহিদা সম্পন্ন এবং মূল্যবান। তবে মাছের চামড়া দিয়েও তৈরি করা যায় অনেক কিছুই। এই অত্যাধুনিক পদ্ধতি থেকে বাদ যায় না মুরগির চামড়াও। বর্তমানে মুরগির চামড়া দিয়েও বানানো হচ্ছে জুতাসহ বিভিন্ন পণ্য। ভারতে প্রথম মাছের আঁশের ব্যবহার করে পণ্য তৈরির প্রচলন ঘটে।

মাছের আঁশ বলতে আমরা সাধারণত মাছের উচ্ছিষ্ট অংশ বুঝে থাকি। যা আমরা সচরাচর ফেলে দেই। তবে এই আঁশের নানাবিধ ব্যবহার সম্পর্কে আমরা অনেকেই অজ্ঞাত। মাছের আঁশের সঙ্গে এর চামড়ারও রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। তবে এতো সব ব্যবহারের মাঝে আফ্রিকার নেউটন ওইনো প্রথম মাছের চামড়া থেকে তৈরি করেন জ্যাকেট, জুতাসহ বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিস। তিনি একটি ফ্যাক্টরিও গড়ে তুলেছেন এই কাজের জন্য। সেখানে প্রায় শ’খানেক মানুষ কাজ করছেন।

প্রতিদিন দেড় লাখ মেট্রিক টন মাছের উচ্ছিষ্ট ব্যবহার করা হচ্ছে এই ফ্যাক্টরিতে। এখানে তৈরি পণ্য ৮০ শতাংশই তৈরি হচ্ছে মাছের আঁশ এবং চামড়া থেকে। এছাড়াও অন্যান্য পশুর চামড়াও ব্যবহার হচ্ছে এখানে। নেউটন ওইনো এই কাজে মাসে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। তার তৈরি পণ্য বিক্রি হচ্ছে সারাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। পুরুষদের বেল্ট, জুতা, বিভিন্ন ধরণের ব্যাগ, তাবু, বিছানার চাদর, কম্বল তৈরি করা হয়। মাছের চামড়া সহজলভ্য হওয়ায় এবং সহজে প্রক্রিয়াজাত করা যায় বলে এর চাহিদা বেড়েছে।

মাছের চামড়া ব্যবহারের উপযোগী করতে তেমন খাটুনির প্রয়োজন হয় না। তবে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় অনেক বেশি। ফিশ লেদার তৈরি করতে সাধারণত মাঝারি থেকে বড় সাইজের মাছের চামড়া বেশি উপযুক্ত। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় স্যালমন মাছ। কয়েকটি ধাপে এই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয়।



চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের উপায়

প্রথমে ছুরি বা লোহার কিছু দিয়ে মাছের চামড়া থেকে আঁশ ছাড়াতে হয়। তবে সতর্ক থাকতে হয় যাতে কোনোভাবে মাছের চামড়া কেটে ছিঁড়ে না যায়। যতক্ষণ না মাছের চামড়া মসৃণ হচ্ছে ততক্ষণ এটিকে স্ক্রাব করতে হয়। এরপর বিপরীত পাশেও স্ক্রাব করে মসৃণ করার পালা। এবার স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি কিংবা হালকা গরম পানিতে ধুয়ে নেয়া হয় মাছের চামড়া। বেশি গরম পানিতে মাছের চামড়া ধোয়া যাবে না। এতে করে কুঁচকে যেতে পারে চামড়াগুলো।



ধুয়ে নেয়ার আগে কিছুক্ষণ পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে চামড়াগুলো। চামড়া যাতে মসৃণ, দুর্গন্ধমুক্ত আর উজ্জ্বল দেখায় এজন্য পানিতে মেশানো হয় ডিম, সূর্যমুখীর তেল বা উদ্ভিজ্জ তেল। অন্তত ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে চামড়াগুলো। এতে করে মাছের চামড়ায় আর্দ্রতা বজায় থাকে। এরপর ভালোভাবে ধুয়ে শুকানোর পালা। ভালোভাবে রোদে শুকানো হয় মাছের চামড়া। যাতে পুরোপুরি ব্যাকটেরিয়ামুক্ত হতে পারে। পঁচা বাভেজা কাঠের ধোঁয়ায় দিয়ে একে নরম করা হয়। যাতে এই চামড়া দিয়ে পণ্য তৈরি করার পর তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত নরম থাকে।



এর আগে চীন ও জাপানে মাছের আঁশ ব্যবহার করে বায়ো-পাইজোইলেক্টিক ন্যানোজ্যানারেটর তৈরি করা হয়। যা দিয়ে রিচার্জেবল ব্যাটারিতে চার্জ দেয়া যায়। তাছাড়া ঘরোয়া বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে এইবায়ো-পাইজোইলেক্টিক ন্যানোজ্যানারেটর। মাছের আঁশের একটি গাঠনিক উপাদান হলো কোলাজেন ফাইবার। যার থেকেই পাওয়া যায় বায়ো-পাইজোইলেক্টিক। অর্থাৎ এর উপর যখন কোনো প্রকার বাহ্যিক চাপ বা শক্তি প্রয়োগ করা হয় তখন এর থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ উৎপন্ন হয়।



বর্তমানে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এবং প্রসাধনী তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে মাছের আঁশ। তেলাপিয়া মাছের আঁশ এবং চামড়া মানুষের পুড়ে যাওয়া অংশে চামড়া প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য গবেষণা চলমান রয়েছে। কৃত্রিম কর্ণিয়া ও কৃত্রিম হাড় তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় মাছের আঁশ। ডিজেনারেটিভ জয়েন্ট ডিসর্ডার রোগের প্রতিকারক হিসেবেও মাছের আঁশ ব্যবহার করা হয়।



আমদের প্রতিনিয়ত ফেলে দেয়া মাছের আঁশ এবং চামড়ার এতো রকমের ব্যবহার সত্যিই অবাক করা। আমাদের চোখে যা বর্জ্য তা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ফেলানা জিনিস দিয়েও তৈরি হচ্ছে মূল্যবান সামগ্রী।

All Right Reserved by © 2017-2020 | Privacy Policy |